মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

হরিপুর উপজেলার পটভূমি

 

 

সীমান্তে হরিপুর উপজেলা

হামিদুর রহমান চৌধুরী

 

ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য

১৯০৯ সালে জন্ম নেয়া হরিপুর থানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-মন্ডিত একটি জনপদ। মাত্র ৭৬ বর্গ মাইল আয়তন বিশিষ্ট থানাটির পূর্বে ও পশ্চিমে দুই উপ নদী কুলিক ও নাগরের মেখলা বেষ্টিত এবংউচু বেলে দো-আঁশ ।বন্যারেখ-বর্হিভূত জলা মৃত্তিকা স্তরে বিভক্ত। পৌরাণিক হরিপুর ছিল আরণ্যক আর অপেক্ষাকৃত অনুর্বর, এর জনগোষ্ঠী ছিল আয়েশী, শ্রম বিমুখ উদ্দোমহীন। চান্দ্র ভূমির মত অমসৃন মৃত্তিকা স্তরে অসংখ্য পুকুর আর ঐতিহ্যবাহী গড় ও পীর দরবেশের মাজার গড়ে উঠেছে। ফলে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ, পেয়েছে ধ্যানগম্ভীর পবিত্ররুপ।

 

ভূতাত্তিক উৎপত্তি ও গুণাগুণের নিরীখে তিস্তার পল্লী অঞ্চল হিসেবে পরিগণিত হলেও বিহারের শুষ্ক মরু অঞ্চলের সঙ্গে এর ভূ-প্রকৃতিক সাদৃশ্য চমকপ্রদ। আগেই বলা হয়েছে, হরিপুরের অধিকাংশ স্থানেই বেলে এবং দো-আঁশ মাটির, আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ, বনাঞ্চল নেই বলে বৃষ্টিপাতও স্বল্প।

 

ইতিহাস

হরিপুরের ইতিহাস সমৃদ্ধ এবং কিংবদন্তী সমারোহে আলোকিত। তথ্য-নির্ভর প্রামাণ্য অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। মেহরাব আলী রচিত দিনাজপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস গ্রন্থে অধুনালুপ্ত রাঘব মেলা ও জমিদার গণের যে তথ্য লেখা হয়েছে তা থানায় রক্ষিত ক্রাইম-রেজিস্টার ও ভিলেজ হিস্ট্রী থেকে নেয়া এবং আংশিক সত্য। অঞ্চলের নাম করণ সমন্ধে লোকশ্রুতি আছে।

 

পরগণা খোলড়ার মেদনীসাগর গ্রামের জমিদার ছিলেন মেহেরুন নেশা। তিনি বিধবা ও অপুত্রক ছিলেন। পাশ্ববর্তী ভৈষা গ্রামের তিলি হিন্দু হরিমোহন ছিলেন তার নায়েব। জমিদার কাজে এই নায়েবেই ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত ব্যাক্তি। খাজাঞ্চিখানায় খাজনা দিতে গিয়ে সূর্যাস্থ আইনের সুবাদে তিনি নিজেই জমিদার হয়ে ফেরেন এবং জীবনপুর মৌজার জঙ্গলের মধ্যে আত্নগোপন করেন। বহু সন্ধানের পর জমিদার মেহেরুন নেসা তাকে তাঁর নতুন আস্তানায় আবিষ্কার করেন এবং অভিষাপ দেন যে, তিনি নিবংশ থাকবেন। বস্তুত সেই দিনের সেই জঙ্গলী আস্তানায় নাকি আজকের দক্ষিণ দালান এস্টেটের জমিদার সাহেবের বাড়ি। সত্য এই যে বংশের ধারা বজায় রেখেছে দত্তক পুত্ররাই শুধু। অতপর হরিমোহন, হরিপুর নামকরণ দিয়ে এখানেই প্রতিষ্ঠা করেন জমিদারি কাছারী। তাঁরা দুই ভাই চুড়ামোহন ও মথুরামোহন পরবর্তীতে জমিদার হিসাবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। হরিমোহনের অপুত্রক ধারার জমিদারী ছেদ নামে ১৮৫৪ সালে ডালহৌসী কর্তৃক পরবর্তিত স্বত্ব বিলোপনিতির মাধ্যমে। সিপাহী বিদ্রোহের পর লর্ড ক্যনিং ১৮৬১ সালে তা পুন: প্রবর্তন করেন নাশকী ব্যবস্থায় বাদশাহ আকবরের রাজত্বকালে টোডরমল কর্তৃক প্রবর্তিত মৌলিক রাজস্ব ব্যবস্থা নাশকী ব্যবস্থা বলা চলে। ব্যাবস্থাটি জমিদারি ব্যবস্থার অনুরুপ। জামুন মেদনী সাগর গ্রামের কাছেই ছিল বেগম মহল, রন্ধনশালা, নটিঘাট ও সুতিঘাটা গ্রামগুলি। খ্যাতিতে এই বন্দর প্রামগুলি হয়তো একদিন মূখর ছিল।

 

ইতিহাস সন্ধানীদের কারো কারো ধারণা, হরিপুরের রাজ বাড়ি প্রতিষ্ঠা হয় ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে জনৈক ব্যবসায়ী ঘনশ্যাম কুন্ডুর দ্বারা । তারই পরবর্তী বংশধর ছিলেন রাঘববেন্দ্র নারায়ন । বর্তমানে ধ্বংস প্রায় রাজবাড়িটি তিনিই নির্মাণ করেন। রাঘববেন্দ্র নারায়নের পুত্র জগেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী ১৯১১ সালে ইংরেজ সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারত আগমনের স্মারক হিসেবে ১৪টি মূর্ত্তি বসান এবং সর্ববৃহৎ দালান বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁর কলকাতার বাস ভবনে বিশাল জাকজমক পূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের দারা সম্রাটের দৃষ্টি আর্কষণ করে রাজর্ষি খেতাবে ভূষিত হন। কুন্ডুদের প্রতাপ প্রতি পত্তির সূর্য তখন অস্তমিত প্রায়। উত্তর দালানের জমিদার রাস বিহারী রায় চৌধুরীর কন্যা ও সর্বাপেক্ষা প্রতাপশালী জমিদার নগেন্দ্র বিহারী রায় চৌধুরীর ভগ্নি ক্ষীড়োদ বাসিনী চৌধুরাণীর স্বামী প্রবোধ চন্দ্র কুন্ডুর মাধ্যমে তাদের লুপ্ত প্রায় ইতিহাসের শিখা রাতের সলতের মতো জ্বলে উঠতে দেখা যায়। বর্তমানে তা বিলুপ্ত প্রায়।

 

হরিপুরের জমিদারদের প্রাচীন ইতিহাস কুয়াশায় ঢাকা হলেও এটা নিশ্চিত, এদের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে মুঘল রাজত্বের অস্তেরাগে। বড় তরফের জমিদার দালান বাটি ছাড়া অন্য দালান ছিল আটপৌরে। স্থাপত্য কারুকাজে ইমারতের গায়ে অলংকরণ ছিল না বলেই চলে। বড় তরফের দালানে ছিল জ্যামিতিক বিন্যাস ও ভাস্কর্য শিল্প, যা বিলুপ্ত হয় ১৯৭৩ সালে বাড়িটি সংস্কারের সময়। অবশ্যই এই সংস্কারের পরেও মূল ইমারত আজোও দাঁড়িয়ে আছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণ জমিদার ভবন ধ্বংস প্রায়।

 

ঐতিহাসিক আবুল ফজল বিরোচিত আইন-ই আকবরীতে সমগ্র দেশ সুবা, সরকার, পরগনা গ্রামে বিভক্তিকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরগনা খোলড়া, ভাতুরিয়া, বারোর প্রভৃতি নিয়ে সরকার তাজপুর গঠিত হয়। হরিপুর হতে প্রায় ০২ মাইল পূর্বে খোলড়া, ০৫ মাইল পূর্বে ভাতুরিয়া ও ০২ মাইল দক্ষিণে ভারতে তাজপুর অবস্থিত। সরকারের সর্বোচ্চ শাসনকর্তা ফৌজদার এখানেই বাস করতেন। এখানে যে কেল্লা তাজপুর রয়েছে তা আজও সবার মুখে মুখে।

 

১২০৬-১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩২০ বছরে প্রায় সমগ্রকার বঙ্গদেশ ছিল স্বাধীন। এর রাজধানী ছিল দিনাজপুরের দেবকোট, গৌড় লক্ষণাবতী ও ১৭০২-১৭৫৬ পর্যন্ত মকসুদাবাদের (মুর্শিদাবাদের) পাণ্ডুয়ায়। লক্ষণাবতীর সুলতানদের গৌরব রশ্মি কুচবিহার, শ্রীহট্ট, তিরন্ডত, আরাকান, উড়িষ্যা, বিহার এমনকি অযোধ্যা জৌনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হরিপুরের দক্ষিণদিক দিয়ে লম্বিত রংপুর-পূর্ণিয়া সড়ক যা সংক্ষেপ পূর্ণিয়া সড়ক নামে পরিচিতি তা লক্ষণাবর্তী সুলতানদের দ্বারা সম্ভবত ১৩৩৫-৪১ সালের দুর্ভিক্ষের কালে নির্মিত। ১৩৩৩ সালে আফ্রিকার তানজানিয়া হতে ভারতে আগত বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা জালালাবাদের বিখ্যাত সুফী শাহ্ জালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১৩৪১ সালে এই পথেই স্বদেশ ফিরে তাঁর বিখ্যাত সফর-নামায় বিশেষভাবে এই সড়কের নাম উল্লেখ করেন। পরগনা ভাতুরিয়ার শিকদার (সামরিক শাষক) ও কেল্লা তাজপুরের শিকদার-ই শিকদারানের অশ্বপদভারে প্রকম্পিত হতো সড়কটি। এই সড়ক দিয়ে ঢল নামত ইসলাম প্রচারক পীর-দরবেশ আউলিয়া-ফকিরদের। তাঁরা ছিলেন তূর্কী, আফগান, মুঘল, সৈয়দ, পাঠান। কেউ এসেছেন রাজানুকূল্যে, কেউবা নির্জন ঐশী আকর্ষণে।

 

হরিপুরের মাজারের সংখ্যা পঞ্চাশোর্ধ। আর এই সংখ্যাধিক্যই প্রমাণ করে, মাজার বাসী সকলে ধর্মপ্রচারক ছিলেন না। এরা অনেকে ছিলেন রাজ্য হারা সুলতানের আত্নীয়-স্বজন, শত্রুতাড়িত গোপন আশ্রয় সন্ধানী, ভাগ্যাণ্বেষী ব্যবসায়ী বা সৌখিন ভ্রমণকারী। হরিপুরের সর্বশ্রেষ্ঠ মাজার জামুন মেদনী জমিদার বাড়ী অননি দক্ষিণে বহরমপুর গ্রামের শাহ্ মাখদুম জালালের (রহ:) মাজারের অসংখ্য ভক্ত প্রতি বছর জমায়েত হন ও মাজার জিয়ারত করেন। খোলড়া, বালিহারা, মিনাপুর, টেংরিয়া, গড়ভবানীপুর, মানিকখাড়ি, মহেন্দ্রগাঁও, কান্ধাল, বীলগড়, রণহাট্টার মাজার ও পূর্ণ্যবানদের দৃষ্টি আজও আকর্ষণ করে। হযরত শাহ্ মাখদুম জালাল (রহ:) এর সত্যিকারের পরিচয় নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে, তিনি শ্রীহট্ট খ্যাত শাহ্ মাখদুম জালাল(রহ:)এর শিষ্য ছিলেন এবং চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি, গুরুর নির্দেশে পূর্ববঙ্গ হতে দেবকোট (উত্তরবঙ্গ) এসে ধর্ম প্রচার কালে মারা যান। কামেল ওস্তাদের নামানুসারে তাঁর মাজার পরিচিত হয়। বস্তুত শাহ্ মাখদুমের মাজার বাংলাদেশের বণ্ড জায়গায় দেখা যায়। অন্য মতে তিনি ভাতুরিয়ার রাজা গণেষের হাতে ১৪১৭/১৮ খ্রিষ্টব্দে ইসলাম ধর্ম প্রচারের অপরাধে নিহত হন। অপর একটি মতানুসারে বহরমপুরের মাজার মাখদুমের নয়, বরং মুকাদ্দামের। মুকাদ্দাম ছিলেন শান্তি-শৃঙ্খলা কাজে নিয়োজিত গ্রামের রাজ প্রতিনিধি। পরগনার শাসণ কর্তা বা শিকদারের এলাকায় চুড়ি-ডাকাতি হলে, আর অপরাধী ধৃত না হলে মুকাদ্দাম গ্রেপ্তার হতেন। খুনিকে হাজির করতে ব্যর্থ হলে তাকে হত্যা করা হয়। গবেষণাই নির্ণয় করবে বহরমপুর মাজারের প্রকৃত তথ্য।

 

ভাতুরিয়া পরগণার জমিদার রাজা গণেষের উল্লেখ অপরিহার্য। ইলিয়াস শাহী বংশের সুরতান গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ্ দিওয়ান ও রাজা গণেষ গড়ের সিংহাসনে বসা মাত্র পাণ্ডুয়ার ধর্ম প্রচারক বিখ্যাত মুসলিম আউলিয়া হযরত শেখ নুরুদ্দীন কুতুব-উল-আলমের আহ্বানে আগত জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহীম শার্কীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। রাজা আউলিয়ার আশ্রয় প্রার্থী হন। উভয় পক্ষের শর্ত মতে রাজ-পুত্র যদুকে মুসলমান করে সিংহাসনে বসান। সুলতান শার্কী জৌনপুরে ফিরে যান। ধুর্ত রাজ পুনরায় সিংহাসন দখল করেন এবং অসংখ্য দরবেশ আউলিয়া হত্যা করে চার বছর পর ১৪১৮ খ্রিষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন।

 

রাজশক্তির আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে জনসাধারণের সহযোগিতায় আউলিয়াগণ গড়ে তুলেন গড়। স্থানীয় রাজ শক্তির পক্ষে এই প্রয়োজনীয়তা ছিল বহি:শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলার ক্ষেত্রে। হরিপুর ও রাণীশংকৈলে অনুরুপ গড়ের সংখ্যা ১০(দশ)। বীরগড়, ভবানিপুরের গড়, ধর্মগড়, রাণীশংকৈল গড় ইত্যাদি এখন লুপ্ত-প্রায় র্কীর্তি হলেও প্রত্নতাত্ত্বিকের কাছে এর মূল্য অপরিসীম।

 

শিক্ষাবিদ বেলাল রব্বনী, অধ্যাপক আবু ইয়াসীন এবং প্রফেসর মনতোষ কুমার দে প্রমুখের মতে গড় ভবানীপুরের বিষদ উল্লেখ ছাড়া হরিপুরের ইতিহাস অসম্পূর্ণ খাকে। হরিপুর থানা হতে ০৬ মাইল পূর্বে গড় ভবানীপুর গ্রামটি অবস্থিত। অনেকের ধারণা গড়টি ভাতুরিয়া পরগণার অন্তর্গত ছিল। ১৪১৪-১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা গণেষ নিজে এই গড় স্থাপন করেন। গৌড়ের সিংহাসনে বসার পূর্বে এই গড়টি স্থাপিত হয়। সিংহাসন লাভের আগে তিনি তাঁর অঞ্চলের প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। রাজা গণেষের মৃত্যুর পর তাঁর হিন্দু বংসধররা ভাতুরিয়া গ্রামে বসবাস করতেন। এই গড় ভবানীপুরের স্থাপিত হয়েছেল গড়ভবানীপুর দূর্গা নামে। যার দৈর্ঘ্য ১.৫ মাইল এবং প্রস্থ ০.৫ মাইল দূর্গের চারদিকে তা এখনো ৫/৬ ফুট উচু মাটির প্রাচীর দেখা যায়। হরিপুরের অন্যতম বৃহৎ তমিদিঘির অবস্থার গড়ের মধ্য বর্তী স্থানে। এর পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে কুলিক নদী প্রবাহিত। নদী এবং জলাশয় দিয়ে দূর্গটি এককালে সুরক্ষিত ছিল।

 

আবার এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে, রাজা গণেষের রাজ কর্মচারী দাহির কর্তৃক এই গড়টি নির্মিত ও গড়ভবানী নামে পরিচিত। রাম, মাধব, গোপাল ও যাদব নামে দাহিরের চার পুত্র ছিল। ভাতুরিয়া ইউনিয়নের মাধবপুর, রামপুর, গোপালপুর ও যাদবপুর প্রভৃতি গ্রামগুলি তাঁদের স্মৃতি বহন করছে।

 

১৭৯৩ খ্রিস্টব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশ প্রবর্তিত চির স্থায়ী বন্দোবস্তোর দ্বারা জমিদারী প্রথার বিলোপ সাধন ঘটে। এর ফলে সবচেয়ে বেশী সর্বনাশ হয় মুসলমান জমিদারদের এ কথা ঐতিহাসিক সত্য এবং প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক হান্টার কর্তৃক সমর্থিত। কর্ণ ওয়ালিশ জমিদারদের খাজনা আদায়কারী প্রায় সকলেই ছিল হিন্দু। ৯০৬-১৭৫৭খ্রিস্টব্দ পর্যন্ত সুদির্ঘ সাড়ে আটশ বছর মুসলিম শাসনের অবসানে মুসলমানেরা হয়ে পড়ে বিশেষ সন্দেহের পাত্র, হিন্দুরা ইংরেজ ভক্ত এবং অনুগত হিসেবে চিহ্নিত হয়।

 

দিনাজপুর রিসার্চ সোসাইটি ও নওরোজ সাহিত্য মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা জনাব মেহরাব আলীর দিনাজপুরের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে এই জমিদার বর্গের যে পরিচয় বিবৃত হয়েছে তাঁর উপর সামান্য আলোক পাতের অবকাশ রয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ডিসেম্বর দরবার দিবসে অফুরন্ত জাঁকজমক আর আমোদ-আহলাদের জন্য জমিদার জগেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী রাজর্ষি খেতাবে ভূষিত হন। অথচ মহাযুদ্ধকালিন দুভিক্ষের সময় প্রজারা খাজনা রিয়াত চাইলে তাদের অন্ধকুপে নিক্ষেপ করা হয়। মুসলমান প্রজাদের খাজনাদি এরা কদাচিত স্ব-হস্তে গ্রহণ করতেন। থানায় সংরক্ষিত ক্রাইম রেজিস্টার এবং ভিলেজ হিস্ট্রিতে দেখা যায়, ১৯৩৪ সালে কারীগাঁও মৌজায় জমিদার নগেন্দ্র বিহারী কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁর লাঠিয়াল বাহিনী ছিল মুসলমান। বাহিনী প্রধানকে তিনি চৌধুরী খেতাব দেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, চৌধুরীরা ছিলেন পরগণার রাজস্ব কর্মচারী। কোরবানী নিসিদ্ধকরণ, ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হরিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিষদের মুসলিম  সদস্য অন্তর্ভূক্তকরণ এবং ছাত্রদের আরবি শিক্ষাদানে অস্বীকৃতি ইত্যাদি কারণে মুসলিম প্রজাদের সঙ্গে জমিদার গণের ত্রিশ বছরের এক গোলা পীর যুদ্ধ শুরু হয়। এই রাজনৈতিক বিতর্কে মুসলমানদের নেতৃদেন বীরগড়ের প্রখ্যাত আলেম ও অনলবর্ষী বক্তা মুন্সি সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরীর ভাতৃদ্বয়। তাঁরা কালীগঞ্জ হাট খোলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান রুপে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন এবং দক্ষিণে রায়গঞ্জ, পশ্চিমে কৃষাণগঞ্জ ও উত্তরে বালিয়াডাঙ্গী থানার মুসমানদের ঈদগাহ হিসাবে এই স্থান নিদিষ্ট করেন। পরবতী কালে দিনাজপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যন রাজ টংকনাথ রায়ের মধ্যস্থতায় দ্বন্দের অবসান হলে মাদ্রাসাটি পূর্ণিয়া সরকের ধারে তোররা গ্রামে স্থানান্তরিত হয়। মুন্সি সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী ও বকুয়া গ্রামের মুন্সি আব্দুল আজিজ স্কুলের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথমোক্ত ব্যাক্তি হরিপুর তাঁতী পাড়ায় মুসলিম ছাত্রদের জন্য এক বিশাল ছাত্রাবাস নির্মাণ করেন। হরিপুরসহ প্রতিবেশী দুই-তিনটি থানা এলাকার মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক জাগরণ ও ঐক্যবন্ধন সৃষ্টিতে বীরগড়ের মুন্সি ভ্রাতৃদ্বয় বিশেষ অবদান রাখেন।

 

সুলতানি ও মোঘল আমলের স্থাপত্য হরিপুরে তেমন একটা চোখে পড়ে না। ব্যতিক্রম শুধু মেদনীসাগর মসজিদ ও বিশালাকার মেদনী দিঘি, যা মেদনীসাগর নামে সমধিক পরিচিত। মসজিদটি মোঘল স্থাপত্ত্যের নিদর্শন। খিলান ছাদে যে তিনটি গম্বুজ দেখা যায়, তা মোঘল রীতির পরিচয় বহন করে। মসজিদটি জমিদারী আমলে দুরদুরান্তের মুসলমানদের ধর্মীয় চাহিদা পূরণ করত। প্রাচীনকাল হতে নিকট অতীত পর্যন্ত অনেক স্থপত্য এখন বিলীয়মান। এর অন্যতম কারণ, সব দালান কোঠা চুনাপাথরের অভাবে মাটি দিয়ে গড়া, ভাটিতে পোঁরানো ইট দিয়ে তৈরী। অনুরুপ নির্মাণ কাজ ক্ষণ-স্থায়ী। তাছাড়া নানাবিদ আগাছা-পরগাছার আগ্রাসন তো আছেই।

 

জমিদারদের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাঁদের সংস্কৃতি সাধনার উল্লেখ না করলে। নাট্য মন্দির ছিল সংস্কৃতি চর্চার পীঠভূমি। আজীবন জমিদার বিদ্বেষী ডাক্তার রামপদ সেন ছিলেন সারস্বত সম্মেলন নামে ভিন্ন এক মুক্তাঙ্গণ সাহিত্য চক্রের প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন মুখি প্রতিযোগিতা, আলোচনা, বির্তক, সভা, নাটক, কবিগান, যাত্রাগান ইত্যাদি সংস্কৃতিক কর্মকান্ডে হরিপুর ছিল মুখর। এই সংস্কৃতি সাধনা হরিপুরের ভৌগোলিক সীমানা ছেড়ে দূরদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে যে কয়েকজন বিদগ্ধ ও কৃতী সন্তানের জন্য তারা হলেন স্বর্গীয় নিশীথনাথ কুন্ডু, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ডিএল রায়ের অনুজ বিএল রায়, জমিদার বিশ্বেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী, ডাক্তার রামপদ সেন, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ বণ্ডগ্রন্থ প্রণেতা যতীন্দ্র মোহন রায় চৌধুরী, প্রফুল্ল ময়রা, ধনঙ্গর বৈরাগী, মঙ্গলা সেন গুপ্ত ও আরতী সেন প্রমুখ। সব ক্রিয়াকার্য বিকাশের উৎস ছিল পূজা-পার্বণ, গুরুত্বপূর্ণ দিবস, নববর্ষ, মেলা, বিবাহ ইত্যাদি। দর্শকরা ছিলেন শিক্ষিত সামন্ত সন্তান, সমাজের শিখর চুড়ায় তাঁদের অবস্থান।

 

হরিপুর থানায় পুরাকীর্তির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য এখানকার অসংখ্য জলাশয়। দেড়শতাধিক ঐতিহাসিক দিঘির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য মেদনীসাগর, বাজার দিঘি, মলানী, যাদুরাণী, পীরদিঘি, আমাইদিঘি, আব্দালদিঘি, তমিদিঘি ইত্যাদি। জনহিতকর কাজ হিসাবে বিশেষত দূর্ভিক্ষ ও খড়া মৌসুমে হোসেনী, ইলিয়াসশাহী, পাঠান, মোগল ও নবাব বংশীয় প্রজাহিতৈষী শাসক বর্গদিঘি সড়ক, সরাইখানা বাগিচা ও মসজিদ তৈরী করেন। সম্রাট আকবরের ভূমি সংস্কারের পর ভূমিকে-পোলাজ, পরোতি, সাসার ও বানজার এই চার ভাগে ভাগ করা হয়। তার মধ্যে সেচযোগ্য প্রথম দুই শ্রেণীর জমি হতেই শুধু রাজস্ব আদায় করা হতো। রাজস্ব বৃদ্ধির সাথে তিনি সমগ্র রাজ্যে অসংখ্য দিঘি খনন করেন। তাছাড়া বঙ্গদেশে দূর্ভিক্ষের সময় হরিপুরের জমিদার বর্গ যে পুকুরগুলো খনন করেন তার প্রমান এখনো বিদ্যমান।

 

হরিপুরের ইতিহাস ও পুরাতত্ব সন্ধানে ঐতিহাসিক মেহেরাব আলী আমাদেরকে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে বেঁধেছেন। এই নিবন্ধের লেখককে সঙ্গে নিয়ে দিনাজপুরের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব জাকারিয়া সাহেব ও ঢাকা যাদুঘরের সাবেক কিউরেটার বন্ধুবর এনামুল হক হরিপুরের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি একাধিকবার পরিদর্শন করেন। পাশ্ববর্তী রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমর্দ বাজারের বিখ্যাত শহীদ নেক বখতের পবিত্র মাজার, গোরকুই গ্রামের গোরক্ষনাথ মন্দির, পাথরের তৈরী অলৌকিক কূপ ও ২০০ (দুইশত) বছরের কারুকার্যময় জামালপুর মসজিদসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদের খুনে রাঙা খুনিয়া দিঘির স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গোরক্ষনাথ মন্দিরে এই যাত্রার সংগৃহিত একটি দুলর্ভ প্রস্তরমূর্তি দিনাজপুর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। জেলা প্রত্নসম্পদসমূহ এখন বিলুপ্ত প্রায়। সরকার ও ওয়ার্ল্ড কালচার হেরিটেজ জেলার প্রত্ন-সম্পদ সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন এটাই কাম্য।

 

(সূত্র: ঠাকুরগাঁও পরিক্রমা : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, প্রকাশনায়: ঠাকুরগাঁও ফাউন্ডেশন)

 

ছবি